মনির উদ্দীন ইউসুফ

প্রাথমিক পরিচয়ঃ বহু ভাষাবিদ , প্রাবন্ধিক, কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার,অনুবাদক,চলচ্চিত্রকার, গল্পকার, সাংবাদিক, এত সবগুণের অধিকারী ব্যক্তির নাম মনির উদ্দীন ইউসুফ। তাঁর লেখার মূল প্রেরণা ছিল ধর্মী জীবন ধারা, মুসলিম ইতিহাস এবং ঐতিহ্য। তিনি ছিলেন ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে পণ্ডিত । তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে সফল অনুবাদক এবং আত্নজীবনী লেখক।

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মনির উদ্দীন ইউসুফ ১৯১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারীর তড়াইল থানার জাওয়ান গ্রামের বিখ্যাত “ জাওয়ান সাহেবের বাড়িতে”। তাঁর নানা ছিলেন জাওয়ানের জমিদার আবদুল হাকিম খান চৌধুরী। সুলতান আমলের “ ইকলিম ই মুয়াজ্জামা-বাদ” নামক প্রদেশের প্রাদেশিক রাজধানী ছিল এখানে । নূর খান ইবনে রাহাত খান মোয়াজ্জেম ছিলেন জাওয়ান বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা । মনির উদ্দীন ইউসুফের পৈতৃক নিবাস ছিল কিশোরগঞ্জের সদর থানার অন্তর্গত বৌলাই গ্রামের বৌলাই সাহেবের জমিদার । তাঁর বাবা ছিলেন জমিদার আল্লামা মিসবাহ উদ্দীন আহমদ এবং মাতার নাম সানজিদা খাতুন। বোলাইয়ে তার পরিবার এক প্রাচীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবার হিসেবে খ্যাত। সম্রাট জাহাঙ্গীর আমলে বাগদাদ থেকে দিল্লিতে আশা মোগল মীর বহর আশায়ক আব্দুল করিম ছিলেন এ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। ভাটি অঞ্চলের নৌ-বাহিনীর কর্তৃত্ব ভার দিয়ে তাকে এ অঞ্চলে পাঠানো হয় । সম্রাট আকবরের সাথে ঈসা খাঁর যে সন্ধি চুক্তি হয় , তারই ধারাবাহিকতায় করিম খাঁর এই নিযুক্তি। ফলে দেখা যায় একটি বনেদি পরিবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম হয় মনির উদ্দীন ইউসুফের। তার পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য কবিসাহিত্যিক আর রাজনীতিবিদ । তাদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন মাওলানা আবদুল হাই , মাহমুদুর রবি খালেদ, দিলগির আঁকবরা বাদি, যোশ মালিহা, মহিউদ্দীন মাহমুদ, সৈয়দ হাবিবুল হক ,প্রমুখ।

শিক্ষা জীবনঃ বহুল প্রজ মনির উদ্দীন ইউসুফের শিক্ষা জীবন শুরু হয় তার বাবার কাছ থেকে । তার বাবা ছিলেন প্রখ্যাত আলেম । সেই সূত্রে বাবার কাছ থেকে আরবি শিক্ষার প্রাথমিক ঙ্গান নেন। এভাবে তিনি শিশুকালেই বহু হাদিস এবং ইসলামিক ইতিহাস ও আত্নজীবনী মুখস্থ করেন। তার বাবার সখ ছিল ছেলেকে আরবী শিক্ষায় শিক্ষিত করা। কিন্তু মনির উদ্দীন ইউসুফ পরিষ্কার জানিয়েদেন তিনি আরবী লাইনে পড়াশোনা করবেন না। ইউসুফের পক্ষ হয়ে তার নানা তার বাবাকে জানিয়েদেন ,ইউসুফ জাওয়ানেই পড়াশুনা করবে। নানার ইচ্ছানুযায়ী ভর্তি হন জাওয়ান আদর্শ ইংরেজী মধ্য স্কুলে । জাওয়ান মধ্য ইংরেজী স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ভর্তি হন কিশোরগঞ্জ রামানন্দ হাই স্কুলে ৭ম শ্রেণীতে। এই সময় তার সহপাঠী ছিলেন সৈয়দ নুরুদ্দীন।এখানে দুই বছর পড়াশুনা করে চলে যান ময়মনসিংহে । সেখানে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে। এখানে এসে তিনি পড়াশুনায় অনেক বেশি মনযোগি হন । ফল শ্রুতিতে ১৯৩৮সালে লেটার সহ  প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরিক্ষায় উত্তীর্ন হন। এরপর তার বাবা তাকে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লার পরামর্শ অনুযায়ী ঢাকা ইন্টারমেডিয়েট কলেজে ভর্তি করেদেন। ১৯৪০ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে আইএ পাশ করেন । ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স । কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতার তাড়না জমিদার পরিবারের সদস্য হিসেবে তাকে প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষা জীবনকে ইস্তফা দিয়ে চলে যান গ্রামের বাড়িতে । বাবার শত অনুরোধও মনির উদ্দীন ইউসুফকে পড়াশুনায় ফিরাতে পারেনি। এখানেই তিনি তার শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন।

পারিবারিক জীবনঃ সব্যসাচী মনির উদ্দীন ইউসুফ বাবার মৃত্যুর পর ১৯৪৪ সালে চাচাত বোন সাজেদা খাতুনকে বিয়ে করেন। সুনামগঞ্জের সেল বয়সের জমিদারে দেখাশুনা করার জন্য স্বসস্ত্রীক সেখানে গমন করেন । ১৯৪৯ সালে মায়ের পরামর্শে তিনি আবার ফিরে আসেন । ১৯৫১ সালে তিনি সপরিবারে চলে যান ময়মনসিং হ শহরে । ১৯৫৪ সালে জমিদারি উচ্ছেদের পর মনির উদ্দীন ইউসুফ নতুন জীবন গঠনের পত্যয় নিয়ে চলে যান ঢাকায় । বাসা নেন লালমাটিয়ায় । এভাবে সপরিবারে ভাসতে ভাসতে সর্বশেষ পুরান ঢাকার আলী নকীর দেউড়ীতে এসে স্থায়ী হন।

কর্ম জীবনঃ মনির উদ্দীন ইউসুফের কর্ম জীবনের শুরু হয় দিল্লীতে। নতুন দিল্লীর জেনারেল হেডকোয়ার্টারে কেন্দ্রীয় সরকারের সেক্রেটারিয়েট চাকুরী নেন। চাকুরির সূত্রে তাকে বোম্বাই পাঠানো হয় । কিন্তু বাবার অসুস্থতার জন্য দেশে চলে আসলে আর ফিরে যান নি। বাবার মৃত্যুর পর তিনি বাবার জমিদারি দেখাশুনা করতে থাকেন । এর মায়ের আদেশ আর মামা আবদুল মোকাব্বির খানের নির্দেশে জওয়ান স্কুলে হেড মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জমিদারী উচ্ছেদের পর ১৯৫৪ সালে ময়মনসিং হে কন্ট্রাক্টরির ব্যবসা নেন । কিন্তু ব্যবসায়ের আগা গোড়া কিছুই জানা না থাকায় লোকসানের সম্মুখীন হন । চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে তিনি ঢাকায় এসে ইংরেজী দৈনিক অবজারভারে এবং পরে দৈনিক বাংলায় চাকুরি নেন। এরপর নিয়োজিত হয় ও সমানিয়া বুক ডিপুর স্বত্বাধিকারী নূরুল ইসলামের পূর্বালী পত্রিকার প্রকাশক হিসেবে। এরপর তিনি ছেলেবেলার বন্ধু সৈয়দ নুরুদ্দিনের আমন্ত্রণে কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে যোগদান করেন। কর্পোরেশনের জনসংযোগ বিভাগে মাসিক “কৃষি সমাচার” নামক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন । তিনি ছিলেন এই পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠানিক সম্পাদক। এই দায়িত্বে কর্তব্যরত অবস্থায় তিনি ১৯৭৯সালে অবসর নেন ।

সাহিত্যিক জীবনঃ মনির উদ্দীন ইউসুফের সাহিত্যিক জীবনের শুরু তার বাবার মাধ্যমে । ছেলেবেলা বাবা থাকে ইসলামের বিভিন্ন কাহিনী বিশেষ করে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর জীবনী বলতেন। তখন থেকেই তার জীবনে সাহিত্য বাসা বাঁধে । সপ্তম শ্রেণী থেকে তার সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ময়মনসিং হে থাকা কালে সুসাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদের সাথে তার পরিচয় তার সাহিত্য চর্চাকে আরো বেশি প্রভাবিত করে । তার শিক্ষাবাদের মধ্যে ছিলেন ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী আব্দুল ওয়াদুদ , মোহিতলাল মজুমদার , ডঃ আশুতোষ ভত্তাচার্য,কবি জসীম উদ্দীন প্রমুখ। তার হাউজ টিউটর ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। এতসব ঙ্গানী গুনীর ছায়ায় তিনি হয়ে ওঠেন একজন স্মরণীয় বরনীয় লেখক। ফলে লেখা-লিখির নেশা তাকে দারুনভাবে পেয়ে বসে । ১৯৪১ সালে তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ “উদায়ন” প্রকাশিত হয় । প্রথম গ্রন্থটি তিনি শিক্ষাগুরু কাজী ওয়াদুদের নামে উৎসর্গ করেন। এরপর রচনা করেন উর্দু বাংলা রচনা করেন। কিন্তু আর্থিক দুরবস্থার কারনে বইটির স্বত্ব বিক্রি করার কারনে বইটিতে তার নাম ছাপা হয়নি। ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয় তার প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ “ইকবালের কাব্য সঞ্চালন” । ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস “ঝড়ের রাতের শেষে” । ১৯৬৩ সালে জন ম্যারিয়ান গাউস রচিত “Refection of public Administration”নামক বইয়ের তর্জমা “জনপ্রশাসনের বিভিন্ন দিক” এবং উর্দু কবি আসাদুল্লাহ খান গালিব এর “দিওয়ানই গালিব” এর অনুবাদ বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়। ও সমানিয়া বুক ডিপো প্রকাশ করে তার জীবনী বিষয়ক গ্রন্থ হযরত ফাতেমা (রাঃ) (১৯৬৩), অনুবাদ গ্রন্থ “ রুমীর মাসনবী (১৯৬৬), হযরত আয়েশা (রাঃ) (১৯৬৮) ।

সৈয়দ নিজামুদ্দিন বিরচিত উর্দু ফার্সি কবিতার অনুবাদ “কালমে রাগিব” প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে । তার রচিত “উর্দু সাহিত্যের ইতিহাস” নামক বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে । তার রচিত “ঈসা খাঁ” নাটকটি প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে । তার রচিত অন্যান্য কবিতা গ্রন্থগুলো হল ঃ রাত্রি নয় কলাপী ময়ূর নয় (১৯৭৬), বেতন পাতা জলের ধারা (১৯৮৪), এক ঝাঁক পায়রা (১৯৮৮), মনির উদ্দীন ইউসুফের অগ্রস্থিত কবিতা-আব্দুল হাই সিকদার সম্পাদিত (১৯৯০), কাব্য সমগ্র বেলাল চৌধুরী  সম্পাদিত (২০০৮) । মনির উদ্দীন ইউসুফের সতের বছরের গবেষণার ফসল বিখ্যাত কবি ফেরদৌসী রচিত “শাহনামার” অনুবাদ গ্রস্থ যার প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৭৭সালে ,১৯৭৯সালে দ্বিতীয়টি এবং ১৯৯১ সালে ৬ খন্ডে রয়েল সাইজে একসেট সমগ্র শাহনামার তর্জমা প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমী কর্তৃক । তার রচিত অন্যান্য অনুবাদ গুলো হলো গালিবের কবিতা (২০০২) , হাফেজের গজল (২০০৮) । তার রচিত ইসলাম ও মুহাম্মদ (সঃ) (২০০৮),তার রচিত আত্নজীবনী গ্রন্থ “আমার জীবন আমার অভিজ্ঞতা (১৯৯২) । তার রচিত অন্যান্য উপন্যাস গুলো হলো পনসের কাটা (১৯৮১) , ওর বয়েস যখন এগারো (১৯৮১), উপন্যাস সমগ্র আব্দুল হাই সিকদার সম্পাদিত (২০০৩) । মনির উদ্দীন ইউসুফ রচিত প্রবন্ধ গ্রন্থ গুলো হলো আমাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতি (১৯৭৮,১৯৮৩,১৯৯৩), কারবালা একটি সামাজিক ঘূর্ণাবর্ত (১৯৭৯,১৯৯১) , বাংলা সাহিত্যে সূফী প্রভাব (১৯৬৯,২০০১) , উর্দু সাহিত্যের ইতিহাস (১৯৬৮) , সংস্কৃতি চর্চা (১৯৮০), বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষে একটি প্রস্তাব (১৯৮৪) , নব মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৯), আত্ন পরিচয় ঐতিহ্যের আলোকে (২০০৩), তার শিশুতোষ গ্রন্থ হলোঃ ছোটদের ইসলাম পরিচয় (১৯৮৬,১৯৯০,১৯৯৩,২০০২), ছোটদের রাসূল চরিত (১৯৯৩,২০০১), চলো যায় ছড়ার দেশে (২০০৩), প্রকাশিত গ্রন্থ চিঠি (বাবির কাছে লেখা ও বাবির ব্যক্তিগত পত্রাবলি ) , মনীষা (বিভিন্ন মনীষীর উপর লেখা প্রবন্ধ অসমাপ্ত কবিতা ও প্রবন্ধ, Iranian influence the Aesthetic Aspects of out life, Karbala is a social whirlpool (প্রবন্ধ), নবমূল্যায়ন ইকবাল (অসমাপ্ত প্রবন্ধ) বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে একটি রাজনৈতিক সামাজিক ইশতেহার ।

চলচ্চিত্র জীবনঃ বহুগুণের অধিকারী মনির উদ্দীন ইউসুফ চলচ্চিত্র অঙ্গনে ও পদার্পন করেছেন । ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি চলচ্চিত্র নির্মানে মনোনিবেশন করেন । তার চলচ্চিত্র গুলো হলো ঃ আলোমতি (১৯৬৯ সংলাপ রচনা) তানসেন (১৯৭০, আংশিক চিত্রনাট্য) , তীর ভাঙ্গা ঢেউ (১৯৭৫ , কাহিনী ,সংলাপ ও গীতি রচনা) ।এ লাইনে তার প্রচুর টাকা পয়সা খরচ হলেও আশানুরোপ ফলপাচ্ছিলেন না । তাই চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে করে নেন ।

পুরস্কারঃ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করা এবং বিদেশী গ্রন্থকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার মাধ্যমে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন মনির উদ্দীন ইউসুফ। অসংখ্য পুরস্কারে ভুষিত হন প্রতিভাবান সাহিত্যিক মনির উদ্দীন ইউসুফ । সাহিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬৮ খ্রীষ্টাব্দে গভর্ণরের স্বর্ণপদ পান। তার অন্যান্য পুরস্কার গুলো হলো বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৮), আবুল মনসুর আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৫) , মরণোত্তর একুশে পদক(১৯৯৯)।

মৃতুঃ বাংলা সাহিত্যতে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার জন্য প্রখ্যাত কবি , সাহিত্যিক ও গবেষক মনির উদ্দীন ইউসুফ নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। বাঙ্গালী পাঠকের জন্য উর্দু – ফার্সি শাস্ত্র পাঠে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন । বহু ভাষাবিধ মনির উদ্দীন ইউসুফ । জমিদার পরিবারে বড় হয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তিনি যে গবেষনা করেছেন তা তা বাংলা সাহিত্যে বিরল ।এই ক্ষনজন্মা পুরুষ ১৯৮৭সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ৬৮ বছর বয়সে ঢাকার শহীদ সোহারাওয়ার্দী হাসপাতালের পরলোকগমন করেন। কিশোরগঞ্জের বৌলাই তাকে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।

কেদারনাথ মজুমদার

প্রাথমিক পরিচয়ঃ

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ,সাংবাদিক ও সাহিত্যিক কেদারনাথ মজুমদার  বাংলা ১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জ্যৈষ্ঠ (ইংরেজি ১৮৭০) বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার কাপাসাটিয়া গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার নিজ বাড়ি গচিহাটা গ্রামে। তার বাবার নাম লোকনাথ মজুমদার ও মায়ের নাম জয়দুর্গা দেবী। মাতৃভূমির প্রতি তার ছিল গভির ভালবাসা। আর সেই ভালবাসার কারনেই তিনি আমৃত্যু পর্যন্ত গবেষণা করে গেছেন তার নিজ জেলা ময়মনসিংহের(তৎকালীন) ইতিহাস নিয়ে। তবে ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা শুধু ময়মনসিংহ জেলাকে নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর বাইরেও তিনি ‘ঢাকার বিবরণ’ ‘ফরিদপুরের বিবরণ’ নামে দুটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তবে ‘ফরিদপুরের বিবরণ’ নামের গ্রন্থটির কোন হদিস এখনও পাওয়া যায় নাই।

শিক্ষা জীবনঃ

কেদারনাথ মজুমদার পড়ালেখা শুরু হয় তার নিজ গ্রামের স্কুলে। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি চলে আছেন ময়মনসিংহ শহরে। সেখানে তিনি ভর্তি হন নাসিরাবাদ এন্ট্রাস স্কুলে। এরপর ভর্তি হন ময়মনসিংহ সিটি স্কুলে। ময়মনসিংহ সিটি স্কুল ছেড়ে ১৮৮৪ সালে তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি  হন।  এ স্কুল থেকে তিনি ১৮৮৯ সালে এন্ট্রাস পাশ করেন। এখানেই তিনি তার পড়ালেখা জীবনের ইতি টানেন।

 

সাহিত্যের সূচনাঃ

কেদারনাথ মজুমদারের সাহিত্যিক জীবন শুরু হয় তার নিজ বাড়ি থেকেই। তার বাবা-মা লোকনাথ মজুমদার ও জয়দুর্গা দেবী উভয়ই ছিলেন সাহিত্যানুরাগী। আর তাদের অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হয়ে পড়েন। নাসিরাবাদ স্কুলের হেড পণ্ডিত বেদজ্ঞ উমেশচন্দ্র বিদ্যারত্নের কাছ থেকে শাস্ত্র ও পুরাণনুশীলনে আগ্রহী হয়ে উঠেন। ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের শিক্ষক শ্রীনাথ চন্দ্র তাকে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ জোগান। এছাড়া তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের ‘মনোরঞ্জিকা ক্লাব’ এ সাহিত্য চর্চা করতেন।

 

 

 

চাকরি জীবনঃ

কেদারনাথয় মজুমদারের বাবা-মার সামান্য কিছু সম্পত্তি ছিল। যা তিনি পরবর্তীতে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন। তাই সংসার চালানোর জন্য তিনি সামান্য বেতনে ময়মনসিংহ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অফিসের ফৌজদারি নকল থানায় নকলনবীশের চাকরি নেন। তবে তিন যে পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তা দিয়ে চাকরি পাওয়া খুব সহজ ছিল না। তাই তার মামা কৃষ্ণকুমার রায় তাকে এ চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। চাকরিতে যে বেতন পেতেন তা দিয়ে সংসার চালানোই ছিল দায়। আর এ চাকরির উপর নির্ভর করেই তিনি সাহিত্য চর্চাও করতেন। তবে তিনি সাহিত্য চর্চার খরচ যোগানের জন্য চাকরির পাশাপাশি পাঠ্য বই প্রণয়ন, ছাপখানা পরিচালনা ও মানচিত্র প্রকাশ ইত্যাদি কাজ করতেন। চাকরি জীবনে তিনি একসময় খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এ অসুস্থ তিনি ১৯০১ সালে চাকরি ছেড়ে দেন।

 

 

 

 

সাংবাদিক ও সাহিত্যিক জীবনঃ

কেদারনাথ মজুমদারের সাহিত্যিক জীবন শুরু হয় স্কুলে পড়া অবস্থা থেকেই। স্কুলে পড়ার সময় তিনি রচনা করেন তার প্রথম উপন্যাস ‘স্রোতের ফুল’। তিনি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রচনা করেন ‘ঢাকা সহচর(১৯০৮-২য় সংস্করণ)’, ময়মনসিংহ সহচর(১৯০৮), বাংলা সহচর, আদর্শ গণিত ও সচিত্রা ভুগল। চাকরি করলেও কেদারনাথ মজুমদারের সাহিত্যকর্ম ও ইতিহাস নিয়ে গবেষণা থেমে থাকেনি। বিভিন্ন নামকরা পত্র-পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হত অহরহ। চাকরি অবস্থাতেই তিনি সম্পাদনা করেন ‘সাময়িকপত্র’। এক সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসার জন্য কলকাতা যান। কিন্তু সেখানে গিয়েও তার সাহিত্য চর্চা থেমে থাকেনি। সংগ্রহ করতেন বিভিন্ন রকমের দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ পাঠ যা তিনি অসুস্থতার মধ্যেও তিনি হাতে লিখে নিতেন।

 

বাংলা ১২৯৫ সালের বৈশাখ মাস থেকে তিনি ‘কুমার’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। যেটি প্রকাশ হয়েছিলো বাংলা ১২৯৫ সালের বৈশাখ সংখ্যা থেকে শ্রাবন সংখ্যা পর্যন্ত। কুমার পত্রিকা বন্ধ হলে তিনি চালু করেন ‘বাসনা’ নামে আরেকটি পত্রিকা। এরপর তিনি ‘আরতি’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাংলা ১৩১৯ সালের কার্তিক মাসে তিনি ‘সৌরভ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর আগে তিনি ‘সম্মিলন’ নামে একটি পত্রিকার পরিচালক নিযুক্ত হন। যার জন্য তিনি কিছুদিন ঢাকায় বসবাস করেন।

 

‘সৌরোভ’ পত্রিকাটি প্রথমে পুস্তাকারে প্রকাশ হত, পরবর্তীতে তিনি এটাকে ম্যাগাজিন আকারে প্রকাশ করেন। ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তি নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি ময়মনসিংহে নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রিসার্চ হাউস’ এবং পত্রিকা প্রকাশের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘সৌরভ প্রেস’।  তার প্রতিষ্ঠিত সৌরভ পত্রিকাটি ছিল সাহিত্যের প্রাণ স্বরূপ। সেখানে লিখতেন পবিত্র কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, সবভাব কবি গোবিন্দ দাস, চন্দ্রকুমার দে ও সৌরভ কুমার রায়সহ নামকরা কবি-সাহিত্যিকগণ। তবে ‘সৌরভ’ পত্রিকাটি ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের পর বন্ধ হয়ে যায়।

 

কেদারনাথ মজুমদার এক সময় সাহিত্যের মধ্যমণি হিসেবে পরিনত হন। স্থানীয় কবি ও লেখকদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সৌরভ সংঘ’। ১৩১৮ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাহিত্য পরিষদ’। এরপর তিনি ‘ময়মনসিংহরে ইতিহাস’ নামে একটি আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯০৪ সালে প্রকাশ করেন  ‘ময়মনসিংহরের বিবরণ’ এবং এ বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন ১৯০৭ সালে। ‘ময়মনসিংহরে ইতিহাস’ ও ‘ময়মনসিংহরের বিবরণ’ রচনা করেন তিনি একজন নামকরা ইতিহাসবিদের খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি ‘ময়মনসিংহের কাহিনী’ ও ‘ময়মনসিংহ পল্লী বিবরণ নামে দুটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এ দুটি বইয়ের কোন হদিস এখনও পাওয়া যায়নি। নিজ জেলার বাইরেও তিনি ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ১৯১০ সালে তিনি রচনা করেন ‘ঢাকার বিবরণ’ এছাড়া তিনি ‘ফরিদপুরের বিবরণ’ নামে একটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তবে ‘ফরিদপুরের বিবরণ’ নামের ইতিহাস গ্রন্থটির কোন সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। বাংলা ১৩১৫ সালে রচনা করেন ‘সারস্বত কুঞ্জ’ নামে একটি গবেষণা গ্রন্থ। ১৯১৭ সালে রচনা করেন বাঙলা ‘সাময়িক সাহিত্য’ গ্রন্থটি। পরবর্তীতে অনেক গবেষক এ বইটিকে গবেষণার জন্য বেছে নিয়েছিলেন।

 

কেদারনাথ মজুমদার জীবনে চারটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ১৮৮৮ সালে যে ‘স্রোতের ফুল’ উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন, পরবর্তীতে সেটির নাম পরিবর্তন করে  ‘প্রফুল্ল’ নামে প্রকাশ করেন। ‘স্রোতের ফুল’ উপন্যাসটির প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ১৮৭৭ সালের নোয়াখালী জেলার প্লাবনের(বন্যার) করুন কাহিনী। বাংলা ১৩৩০ সালে তিনি প্রকাশ করেন ‘শুভদৃষ্টি’ উপন্যাস এবং ১৩৩১ সালে প্রকাশ করেন ‘সমস্যা’ উপন্যাস। তিনি ‘দস্যুর মহত্ত্ব’ ‘সপ্ন’ ও ‘ঋণ পরিশোধ’ নামে তিনটি ক্ষুদ্র উপন্যাস লিখিছিলেন। এ তিনটি উপন্যাসকে সমষ্টি করে ১৯০৬ সালে জুলাই মাসে প্রকাশ করেন ‘চিত্র’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস।

 

রামায়ন নিয়ে গবেষণাঃ

বাংলা ১৩১০ সাল থেকে কেদারনাথ মজুমদার সনাতন(হিন্দু) ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ ‘রামায়ন’ মহাকব্যকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।  তবে সে সময় রামায়ন নিয়ে গবেষণা করা ছিল খুবই কঠিন কাজ। তিনি ‘রামায়ন’ কে একটি ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক গ্রন্থ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। রামায়নের উপর গবেষনা স্বরূপ তিনি ‘রামায়ন সমাজ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যে বইটি তার মৃত্যুর দুই বছর পর প্রকাশ হয়েছিলো।

 

মৃত্যুঃ

‘রামায়ন সমাজ’ গ্রন্থটি রচনা করার সময় কেদারনাথ মজুমদার খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৬ই জ্যৈষ্ঠ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী

প্রাথমিক পরিচয়ঃ

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে এক নক্ষত্রের নাম। তিনি ছিলেন সাহিত্যিক সাংবাদিক ও চিত্রকর। তাকে সঙ্গীতও বলা হয়। এর জন্য কিশোরগঞ্জে রায় পরিবারের সুনাম পুরো উপমহাদেশে ছড়িয়ে যান। তার ছেলে সুকমার রায় ও তাকে ছাড়িয়ে যান। পরে তার নাতি ( সুকমার রায়ের ছেলে) সত্যাজিৎ রায় অস্কার বিজয়ের মাধ্যমে রায় পরিবারের সুনাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেন। রায় পরিবারের তিনি প্রজন্মের তিন পুরুষই শিশু সাহিত্যর এক অনন্য নাম। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী এর সূত্রপাত করেন।

 

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ-১

বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১৯৬৩ সালে ১০ মে ( তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলা ) বর্তমান কিশোরগঞ্জের  কটিয়াদি থানার মসুয়া গ্রামে এক ধনী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবার নাম শ্যামসুন্দর মুন্সী। ও মায়ের নাম জয়তারা। শ্যামসুন্দর মুন্সীর অপর নাম কালীনাথ চৌধরী। শ্যামসুন্দর মুন্সী ও জয়তারার ঘরে আসে ৮টি সন্তান। সরাদারঞ্জ, গিরিবালা, কামদারঞ্জন,( ? ) কুলদারঞ্জন, প্রমদারঞ্জন, ও মৃনালিনি। কাদারঞ্জন পরবর্তীতে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন। তার বড় ভাই সরাদারঞ্জন ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ।

 

জন্ম ও বংশ পরিচয় ২ –ঃ

কালীনাথ রায় ( শ্যামসুন্দর মুন্সী ) এক নিকট আত্নীয় হরি কিশোর চৌধরী বাস করতেন একই গ্রামে। তিনি ছিলেন এই গ্রামের এক প্রভাবশালী লোক। সম্পদের দিক দেয়েও শ্যামসুন্দর মুন্সীর চেয়ে অনেক এগিয়ে। তবে দুঃখের বিষয় এক দিক দিয়ে তিনি পিছিয়ে। শ্যামসুন্দর মুন্সীর ৮ সন্তান কিন্তু হরি কিশোর চৌধরীর কোন সন্তান ছিলনা। তাই হরি কিশোর চৌধরী শ্যামসুন্দর মুন্সীর কাছে একটি সন্তান দত্তক হিসেবে চান। আত্নীয় সম্পর্কর জন্য তিনি রাজি হয়। এবং তার ৫ বছরের ছেলে কামদারঞ্জনকে ( উপেন্দ্র কিশোর) নির্দাবী করে দিয়ে দেন। হরি কিশোর চৌধরী খুশি হয়ে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নামে তার সকল জমি লিখে দেন। এবং কামদারঞ্জন নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখেন উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। তবে পরবর্তীতে হরি কিশোর চৌধরীর ঘরে একটি ছেলে সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন। তার নাম নরেন্দ্র কিশোর। পরে হরি কিশোর চৌধরী মারা যায়। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী কলকাতায় স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন এবং নরেন্দ্র কিশোর তার বাবার জমিদারির ভার গ্রহণ করেন। তবে উল্লেখ্য যে  এই জমিদারিতে নরেন্দ্রর কোন অংশীদারী ছিল না। কারন হরি কিশোর চৌধরী উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নামে তার সকল জমি লিখে দেন। কিন্তু পরে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তার সম্পতির অর্ধেক তার ছোট ভাই নরেন্দ্র কিশোর এর নামে লিখে দেন। এবং বাকি অর্ধেক সম্পতি তিনি তাকেই দেখার দায়িত্ব দেন।

 

শৈশবঃ

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর শৈশব কাটে প্রথম ৫ বছর নিজ পরিবারে। পরের সময়টা কাটে হরি কিশোর চৌধরীর বাড়িতে। পরবর্তীতে তার উইলকৃত নিজ বাড়িতে। তৎকালীন ময়মনসিংহে মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদীতে। এই নদীর কূলেই ছিল মসূয়া গ্রাম। তিনি বড় হন এই নদী দেখে। তা ছাড়া তাদের মসূয়া গ্রামটি ছিল গাছ-পালা নদী-নালায় এক সুন্দর্যর অপরূপ নিলা ভূমি।। ব্রহ্মপুত্র নদীর কল কল দেউয়ের শব্দ ও রূপ নিয়ে তিনি বড় হন। চারদিকে ফসলের মাঠ তাকে করে প্রানবন্দ। এই ব্রহ্মপুত্র নদী ও গ্রাম তাকে সাহিত্যর প্রতি মন গড়তে সাহায্য করেন। বাবা হরি কিশোর চৌধরীর কাছে তিনি ছিলেন একটি হিরের টুকরা। তাই আদরে যত্নে তার কোন অভাব হয়নি। যখন যা চেয়েছেন তাই পেয়েছেন। তার পড়ালেখার প্রতি তারা বাবা হরি কিশোর চৌধরী ছিলেন অনেক আগ্রহী। তাকে ভর্তি করেন স্কুলে। তিনি গান বাজনার প্রতি ছিল আগ্রহী। যেখানে গান বাজনা ও সাংস্কৃতি অনুষ্টান হত সেখানেই তিনি অংশ গ্রহণ করতেন। তাই বলা যায় একজন সাহিত্যমনা মানুষের যে ধরনের পরিবেশের ধরকার উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তার পুরুটায় পেয়েছেন।

 

শিক্ষা জীবনঃ

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর পড়ালেখার শুরু করেন তার নিজ বাড়িতে (হরি কিশোর চৌধরীর বাড়িতে ) । তার বাল্য শিক্ষার জন্য এক পণ্ডিত রাখা হয় তার নিজ বাড়িতে। এরপর তাকে ভর্তি করেন ময়মনসিংহের জেলা স্কুলে। ময়মনসিংহে এসে তিনি গগনচন্দ্র নামে এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সংস্পর্শে আসেন। তিনি ব্রাহ্মণ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৮৮০ সালে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ময়মনসিংহের জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাশ করেন। এরপর তাকে ভর্তি করেন কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে। এ কলেজ থেকে তিনি ১৮৮২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এরপর তিনি ভর্তি হয় কলকাতার মেট্রোপলিটন কলেজে বি,এ ক্লাসে। ১৮৮৪ সালে তিনি বি,এ পাশ করেন। এরপর তিনি পড়ালেখার ইতি টানেন।

 

বিবাহ বন্ধন ও পারিবারিক জীবনঃ

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী কলকাতায় থাকার সময় শরীয়তপুরের লনসিং স্কুলের পণ্ডিত ( পরে কলকাতায় স্থানান্তরিত ) দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যয়ের বাসায় আসা যাওয়া করতেন। দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যয় ছিলেন একজন নারী শিক্ষার অগ্রপথিক। তার স্ত্রী বরিশালের মেয়ে কদম্বিনী দেবী ছিল ১ম ভারতীয় গ্রাজুয়েট মহিলা ডাক্তার। তাদের বাসায় যাওয়া আসা সুবাদে দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যয়ের বড় কন্যা বিধুমুখীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। ১৮৮৬ সালে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী পারিবারিক মত উপেক্ষা করে বিধুমুখীকে বিয়ে করে বাসায় নিয়ে আসেন। প্রথম দিকে তাদের বিয়ে মেনে না নিলেও পরে ছেলের কথা চিন্তা করে এই বিয়ে মেনে নেন। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ও বিধুমুখীর ঘরে আসে ৬টি সন্তান। ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে। ছেলেরা হল সুকুমার রায়, সুবিনয় রায়, ও সুবিমল রায় ( মেয়ে ) সুখলতা রায়, পুন্যলতা চক্রবর্তী, ও শান্তিলতা রায়। তার বড় ছেলে সুকুমার রায় ছিল একজন বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক। তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে F. R. P. S উপাধি পান। সুকুমার রায়ের ছেলে সত্যজিৎ রায়ও ছিল একজন শিশু সাহিত্যিক এবং ১ম বাঙ্গালী অস্কার বিজয়ী। তার ২য় ছেলে পত্রিকার সম্পাদনা করতেন। ছোট ছেলে সুবিনয় গল্প ও কবিতা লিখতেন। বড় মেয়ে ছিল গল্পকার, চিত্রকার ও বহু গানের রচয়িতা। ২য় কন্যা একজন শিশু সাহিত্যিক ও ছোট কন্যা অকালে মারা যান।

 

কর্ম জীবনঃ

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী নিজেই নিজের কর্মসংস্থান করেছিলেন। এই জন্য চাকরির জন্য কারো কাছে যেতে হয়নি। প্রেস ব্যবসা, ছবি আঁকা, সংবাদপত্র প্রকাশ, বই লেখা এই গুলোকে তিনি কর্ম হিসেবে বেঁচে নেন। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ময়মনসিংহের জেলা  স্কুলে পড়ার সময় তিনি ছবি আঁকা শিখেন। কলকাতায় মেট্রোপলিটন কলেজে বি,এ  পাশ কারার পর তিনি ভিবিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখতেন এবং ছবি আঁকতেন। ১৮৮৫ সালে তিনি নিজেই একটি প্রেস প্রতিষ্টা করেন। প্রেসের নাম দেয় ইউ রায় এ্যান্ড সন্স। প্রেসটির জন্য তিনি যন্ত্রপাতি আনেন ইংল্যান্ড থেকে। এ প্রেসে তিনি নিজের বই ও পত্রিকা ছাপাতেন। পাশাপাশি তিনি অন্যদের কাছথেকে ও অর্ডার নিতেন। তিনি নিজের বইয়ের ছবি নিজেই আঁকতেন। এবং তিনি অন্যদের বই, পত্রিকার ও পোস্টারের ছবি আঁকতেন। এতে তার ভালই আয় হত। তার প্রেসের মান ভাল তাই চারদিকে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। একসময় তার কাজের প্রেসার আরও বেড়ে যায়। এছাড়াও বই লেখা, পত্রিকার জন্য অনেক সময় দিতে হত। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর ছেলে সুকুমার রায় ইংল্যান্ড থেকে ছবি আঁকা মুদ্রণ ও স্টুডিও পরিচালনার উপর প্রশিক্ষণ দিয়ে বাবার প্রেসে কাজ শুরু করে দেন। এরপর তাদের প্রেসের উন্নতি আরও বেড়ে যায়। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর সুকুমার রায় প্রেসের ভার নেন।

 

সাংবাদিক জীবনঃ

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করতেন। মেট্রোপলিটন কলেজে পড়ার সময় তিনি ‘ সখা” ও মুকুল পত্রিকায় লিখতেন। ১৯১৩ সালে তিনি নিজেই একটি পত্রিকা খুলেন। এর নাম দেন সন্দেশ। পত্রিকার সম্পাদনার ভারও নিলেন তিনি নিজেই। এ পত্রিকায় তার নিজের লেখার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য লেখকদের লেখাও ছাপা হত। এ পত্রিকায় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিজয় চন্দ্র, শিব নাথ শাস্রী, যোগেশ্চন্দ্র সহ বিখ্যাত লেখকেরা লেখা পাঠাতেন। এ ছাড়া তার পরিবারের সকলেই ছিল লেখক। তার পরিবারের সকলেই সাহিত্যর প্রতি এমনই আগ্রহ ছিল যে অন্য কেউ লেখা না পাঠালেও উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর পত্রিকা ছাপাতে কোন ধরনের সমস্যা হত না। কারন তার পরিবারের সকলে ছিল সাহিত্যমনা। তার নিজের প্রেসে তিনি সন্দেশ পত্রিকা ছাপাতেন। তিনি পত্রিকার ছবি নিজেই আঁকতেন। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী সাহিত্য , সাংবাদিকতা, চিত্র আঁকার পাশাপাশি তিনি সংগীত চর্চাও করতেন। তিনি বেহালা, ঢোল, সেতার, ও হারমনিয়াম বাজাতে পড়তেন। এক সময় তিনি বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারক ‘ ডোয়াকিন কোম্পানি’ একটি সঙ্গীত পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকাটির নাম দেন ‘ সঙ্গীত শিক্ষা” এর সম্পাদনার দায়িত্ব তিনি নিজেই গ্রহণ করেন।

 

সাহিত্যিক জীবনঃ

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী শুধু একজন সুসাহিত্যিকই নয় তিনি সাহিত্য তৈরির কারিগর বটে। তিনি নিজে সাহিত্য চর্চা করতেন এবং পাশাপাশি তার পরিবারের সকলকে সাহিত্যমনা করে তুলেন। তিনি ছাত্র জীবন থেকেই সাহিত্য চর্চা করতেন। ছাত্র অবস্তায় তিনি প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক প্রমদাচরন সেন প্রতিষ্টিত ‘ সখ’ পত্রিকায় লেখা পাটাতেন। ১৮৮৩ সালে তার প্রথম লেখা ‘ মাছি’ শিশুতোষ নিবন্দ সখ পত্রিকায় ছাপা হয়। এরপর তিনি নিয়মিত এই পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন। পর মাকড়সা, ধূমপান, নিয়ম এবং অনিয়ম, গিলফর সাহেবের অদ্ভুত সমুদ্র যাত্রা ইত্যাদি অনেক গুলো লেখা প্রকাশ হয়। ১৯৮৩ সালে তিনি সন্দেশ পত্রিকা প্রকাশ করলে তার লেখা বেশিরভাগ এই পত্রিকায় প্রকাশ পায়। ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত গ্রন্থ ছেলেদের রামায়ন। এটি তার প্রথম প্রকাশিত বই। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত হয় সেকালের কথা বইটি। এটি ছিল জীববিদ্যার উপর লেখা। ১৯০৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘ ছেলেদের মহাভারত’। ১৯০৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘মহাভারতের গল্প” গ্রন্থটি। এই দুটি পুরানিক কাহিনী। এই তিনটি গ্রন্থ তৎকালীন কিশোরদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগান। ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় ‘ টুটুনির বই’ গল্পটি। এই  বইটি শিশু কিশোরদের নিয়ে লেখা। এটি শিশু সাহিত্যর ক্ষেত্রে তার এক অবদান। উনিশ শতক থেকে শুরু করে এখনও বইটি এটি একটি জনপ্রিয় বই। ১৯১১ সালে প্রকাশিত হয় ‘ ছোটদের রামায়ন’ বইটি প্রকাশের ৬ বছর পর প্রকাশিত হয় ‘ আরও গল্প’’ নামে আরেকটি গল্প বই। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘ পুরানের গল্প’’ নামক বইটি। এই দুটি পুরান কাহিনী সম্বলিত। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী রচিত প্রায় সকল বই ছোটদের জন্য রচিত। সে সময় এই সকল বই শিশুদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

 

মৃত্যুঃ

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী জীবনের শেষ সময়ে এসে ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন। সে সময় এ রোগের তেমন চিকিৎসা ছিলনা। তাই তিনি এই রোগে অনেক ভেঙ্গে পড়েন। পড়ে ১৯১৫ সালে ২০ই ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।