তুলসী লাহিড়ী

প্রাথমিক পরিচয়ঃ স্বনামধন্য নট,নাট্যকার,চলচ্চিত্রকার, পরিচালক অভিনেতা,গীতিকার , সুরকার আর সংগীত শিল্পির নাম তুলসী লাহিড়ী। এক কথায় তিনি ছিলেন অসম্ভব প্রতিভার অধিকারী। নাটক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র যে জায়গায় তিনি স্পর্শ করেছেন সবই যেন সোনা হয়ে যেত । তার সংস্পর্শে এসে অনেক প্রতিভাবান শিল্পী অভিনেতা আর নট-নটীর উদ্ভব হয় । সমকালীন শিল্পীগোষ্ঠীর আদর্শ ছিল তুলসী লাহিড়ী ।

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ বহুমাত্রিক গুনের অধিকারী তুলসী লাহিড়ী ১৮৯৭ সালে গাইবান্ধা( তৎকালীন রংপুর ) জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা গ্রামের জমিদার পরিবারে জন্ম নেয় । তুলসী লাহিড়ীর প্রকৃত নাম হেমেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী।তার বাবার নাম সুরেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী এবং মাতার নাম শৈবালা দেবী । তুলসী লাহিড়ীর ছোট দুই ভাইয়ের নাম গোপাল লাহিড়ী ক্লারিওনেট এবং শ্যামাদাস লাহিড়ী এসরাজ ।

শিক্ষা জীবনঃ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তার পড়াশুনার জীবন শুরু । কিন্তু তা বেশি দিন চলতে পাড়েনি স্কুলের অন্যান্য বন্ধুদের সাথে “কার্জন বিরোধী” আন্দোলনে সামিল হলে তিনি পুলিশী নজরে পড়েন । তাই কোচ বিহারে পিতৃদেবের করদমিত্র রাজ্যে ব্রিটিশ শাসনের বাইরে চলে যান । কিন্তু কোচবিহারে কলেজ তখন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই নাম পরিবর্তন করে বিহার প্রদেশের এক কলেজে ভর্তি হন। সেই থেকে তার নাম হেমেন্দ্র লাহিড়ী থেকে হয়ে যায় তুলসী লহিড়ী । বিহার থেকে কৃতিত্বের সাথে বি,এ পাশ করার পর  তিনি কলকাতায় চলে যান । কলকাতা আইন কলেজ থেকে তিনি বই, এল পাশ করেন।

কর্মজীবনঃ সঙ্গীতঙ্গ তুলসী লাহিড়ী কর্মজীবনের শুরুতে আইন ব্যবসাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। প্রথমে তিনি নিজ এলাকা রংপুরে আইন ব্যবসা করেন । পরে তিনি চলে যান সেখানকার আলিপুর কোর্টে ওকালতি শুরু করেন । এরপর তিনি ঐতিহ্যবাহী নাট সংগঠন রংপুর নাট্য সমাজের সাথে যুক্ত নন। নাট্যজীবনের প্রতি অধিক ভালোবাসায় তিনি আইন ব্যবসা ছেড়ে দেন। প্রথম যাবত অভিনয় ,পরে নাট্যপরিচালক পর্যন্ত হন এবং নাটক রচনা করতে শুরু করেন। তার খ্যাতির স্বরূপ তিনি “হিজ মাস্টার্স ভয়েজ ও মেগাফোন” গ্রামোফোন কোম্পানিতে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন। পরে তিনি চলচ্চিত্রের সাথে নিযুক্ত হন।

বিবাহ বন্ধন ও পারিবারিক জীবনঃ বহুগুণের অধিকারী তুলসী লাহিড়ী তিন বিয়ে করেন । তার পুত্র ও দুই কন্যার জননী। তার এক পুত্রের নাম দীনেন্দ্র চন্দ্র ওরফে হবু লাহিড়ী । কমলা ঝরিয়ার সাথে গান অভিনয়ের কাজ করতে করতে তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয় । কমলা ঝরিয়া ছিলেন তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন । কমলা ঝরিয়া প্রথম দুটি গানের সুর করেন তুলসী লাহিড়ী। এরপর তিনি তুলসী লাহিড়ীর অসংখ্য লেখা ও সুর করাগান করেন। এভাবে তাদের সম্পর্ক গাঢ় হয়। এ সম্পর্ক একসময় তাদেরকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে। কিন্তু তুলসী লাহিড়ীর পরিবার তাদের এ সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি। তাই তুলসী লাহিড়ী তার দ্বিতীয় স্ত্রী সন্তানদের ফেলে কমলা ঝরিয়াকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন । কমলা ঝরিয়া ও তুলসী লাহিড়ী সমাজ সম্পর্কের বাইরে এক কীর্তিমান শিল্পের গড়ে তুলেন। কিন্তু তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা তাদের সম্পর্কে নানা কুৎসা রটনা করতে থাকেন । তুলসী লাহিড়ীর বাবাকে বিভিন্ন লোক চিঠির মাধ্যমে গালি গালাজের বার্তা পাঠাতে থাকে । এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তুলসী লাহিড়ী পরিবার তাদের সম্পর্ক মেনে নিলে কমলা ঝরিয়াকে তিনি কলকাতার ১৫৮/সি রাসবিহারী এভিনিউয়ের একেবারে সদর রাস্তার পাশে একটি বেশ বড়োসড়ো তিনতলা বাড়ি কিনে দেন ।তিরিশের যুগের গোড়ার দিকে যে সম্পর্কের সূচনা তা তুলসী লাহিড়ীর মৃতুকাল অর্থাৎ ১৯৫৯ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ছিল। সেখানে ছিল ভালোবাসা আর অগাঢ় বিশ্বাসের বসতি । সমাজের বিভিন্ন মহলের অপচেষ্টাও তাদের এ সম্পর্কে সামান্য চির ধরাতে পারেনি।

নাট্যজীবনঃ নাট্যকার এবং নাট্যঅভিনেতা হিসেবেই প্রথম পরিচয় লাভ করেন তুলসী লাহিড়ী। ঐতিহ্যবাহী নাট সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর নাটকে হাতেখড়ি হয়। তুলসী লাহিড়ী অভিনিত প্রথম নাটকের নাম “কর্নাজুন” ।এরপর তিনি একে একে অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “চিরকুমার সভা” শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “দত্তা” প্রভৃতি নাটকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ,মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং তৎকালীন সমাজের নানা সমস্যা আর অভাব অনটনকে চিত্রায়িত করার জন্য নাটক রচনা করতে শুরু করেন। তিনি রচনা করেন দুঃখীর ইমাম(১৯৪৭), ছেড়াতার(১৯৫০), মায়ের দাবি (১৯৪১), পথিক(১৯৫১), লক্ষ্মীপ্রিয়ার সংসার(১৯৫৯), বাংলার মাটি(১৯৫৩), ঝড়ের নিশান(১৯৬০)। তুলসী লাহিড়ী বিরচিত সর্বশেষ নাটক “ক্ষনিকের অতিথি”। তিনি প্রথমে “আনন্দম” ও পরে “রূপকার” নামে দুটি নাট্যদল গড়ে তুলেন। তার সবগুলি নাটবই ছিল দর্শক নন্দিত । নাটকগুলো তিনি নিজেই মঞ্চস্থ এবং অভিনয় করেন। বাংলা সাহিত্যের নবধারার সৃজন কাল বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কে তুলসী লাহিড়ী রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা।

সঙ্গীত জীবনঃ প্রখ্যাত গীতিকার ,সুরকার ও গায়ক তুলসী লাহিড়ীর সঙ্গীত চর্চা হাতেখড়ি হয় পিতার কাছ থেকে। প্রথমে তিনি রংপুরের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং পূজার অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করতেন। তিনি ছিলেন রংপুর ইন্সটিটিশন ক্লাবের সদস্য। কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় আত্ননিয়োগ করেন সঙ্গীত চর্চায় । গান শিখের কানাকৃষ্টের কাছে। এরপর ওস্তাদ সালমত আলী খানের কাছে শিখেন উচ্চসংগীত । তাকে গান শিখার এই সুবর্ণ সুযোগ করেদেন গায়ক অতুল প্রসাদ সেন। সর্ব প্রথম তার স্বরচিত দুটি গান গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া(হিজ মাস্টার্স ভয়েজ) থেকে করান তুলসীবুবু। এতে তাকে সহায়তা করেন উস্তাদ জমিরুদ্দিন সরকার । এরপর তাকে তার পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি । “হিজ মাস্টার্স ভয়েজ ও গ্রামোফোন কোম্পানিতে” কাজী নজরুল ইসলামের সাথে সঙ্গীতে কণ্ঠ মিলান । সেই সুবাদে মঞ্চস্থ বিভিন্ন নাটকে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। এসব সঙ্গীতের বেশী ভাগই ছিল রবীন্দ্রনাথের। তুলসী লাহিড়ী প্রথম সুর সংযোজনা করেন আর্ট – থিয়েটারের “স্বরম্বরা” নাটকে,”যমুনা পুলিশে” ছায়াছবির গান তিনি রচনা করেন । তার সংস্পর্শে এসে কমলা ঝরিয়া খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করেছেন । কমলা ঝরিয়ার প্রথম দুটি গান “প্রিয় যেন প্রেম ভুল না” ও “নিঠুর নয়ন –বান কেন হান” তুলসী লাহিড়ী সুর করেন। তৎকালীন সময়ের আলোর দৃষ্টিকারী গায়িকা ইন্দুবালা,আঙুরবালা, আশ্চর্য ময়ী ,হরিমতী প্রভৃতি সবাই তুলসী লাহিড়ীর লেখা সুরকরা গান গেয়েছেন।

চলচ্চিত্র জীবনঃ যুগনায়ক তুলসী লাহিড়ী নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রের অভিনয় করেন । সর্বপ্রথম তুলসী লাহিড়ীকে চলচ্চিত্রের পর্দায় দেখা যায় “চপু”ছবিতে যেটি পরিচালনা করেছিলেন হীরেন্দ্রনাথ বসু। তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ হাস্যরসাত্নক অভিনেতার নাম ছিল তুলসী লাহিড়ী । তার প্রথম ছায়াছবি “মনিকাঞ্চন”।“যমুনা পুলিশে” ছায়াছবিটির চিত্রকাহিনীর রচিতা তিনি। “রিক্তা” ও “মনিকাঞ্চান” ছবির চিত্রনাট্য এবং অভিনয় করেন তুলসী লাহিড়ী । পঞ্চাশটির ও বেশি ছবিতে অভিনয় করেন তুলসী লাহিড়ী।

মৃত্যুঃ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যুগনায়ক তুলসী লাহিড়ী একাধারে ছিলেন সফল মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রাভিনেতা,নাট্যকার,সুরকার ,সঙ্গীত পরিচালক ,চিত্রনাট্যকার এবং চিত্রপরিচালক । কমলা ঝরিয়ার রাসবিহারী এভিনিউয়ের বাড়িতেই ১৯৬৯সালের ২২শে জুন শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেন তুলসী লাহিড়ী।

কাজী আরেফ আহমেদ

প্রাথমিক পরিচয়ঃ তখুড় আর নির্লোভ রাজনীতির এক বলিষ্ঠ উদাহরন মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলনের জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদ। এই মহান ব্যক্তি ছিলেন স্বাধীন বাংলার পতাকা তৈরির অন্যতম রূপকার । বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রচনাও এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সক্রিয় ভূমিকা রাখেন । বাংলাদেশের প্রথম বিরোধীদল জাসদ গঠনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন এই জনদরদীনেতা। স্বাধীনতার সংগ্রামকালে এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিশুদ্ধ চরিত্রের নাম মেধা ও প্রঙ্গায় দীপ্যমান আপসহীন নেতা কাজী আরেফ আহমেদ।

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত মহিয়ান নেতা কাজী আরেফ আহমেদ ১৯৪৩সালে ৮ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার সদর থানার ঝউদিয়া গ্রামে নানার বাড়িতে জন্ম গ্রহন করেন। তার বাবা ছিলেন কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর থানার কচু ডারিয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারের বাসিন্দা । কাজী আরেফ আহমেদের বাবার নাম কাজী আব্দুল কুদ্দুস ও মা খোদেজা খাতুন।

শিক্ষা জীবনঃ মানব দরদী কাজী কাজী আরেফ আহমেদের শিক্ষা জীবন শুরু হয় ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে এবং সেখান থেকেই তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন । এরপর জগন্নাথ কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন । সেখান থেকেই ১৯৬৬ সালে বিএসসি পাশ করেন। এরপর মাস্টার ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে। কিন্তু আন্দোলন ,সংগ্রাম আর আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের ফলে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন না করেই শিক্ষা জীবনের সমাপ্ত করতে হয়।

রাজনৈতিক জীবনঃ অনুকরনীয় রাজনীতিবিদ কাজী আরেফ আহমেদ রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন ১৯৬০সালে ছাত্রলীগে যোগদানের মাধ্যমে। অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী আর সাহসী কাজী আরেফ আহমেদ অতিদ্রুত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন । এসময় তিনি স্বাধীনতার লক্ষ্যে ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত করতে ছুটে বেরিয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে । দৃঢ়তা আর সাহসিকতার পুরষ্কার স্বরূপ তিনি পান ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতির পদক । ১৯৬৩ থেকে১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংসদের সদস্য । স্বাধীন জাতির রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তার নেতৃত্বে ১৯৬২ সালে ছাত্র লীগের অভ্যন্তরে গঠিত হয় স্বাধীনতার “নিউক্লিয়াস” যা পরবর্তীতে “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ” নাম নেয়। ছাত্র আন্দোলনকে আরও বাগবান করার জন্য ১৯৬২ সালে তিনিই গঠন করেন “ইন্টার ডিগ্রি ছাত্র ফোরাম”। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে স্বাধীনতার অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যান । ১৯৬৪ সালে শাসক গোষ্ঠীর চক্রান্তে সংঘটিত সাম্প্রতিক দাঙ্গা প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ ।তার একক প্রচেষ্টায় ছাত্রলীগের উদ্যোগে ১৯৬৪ সালের ১৪থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় বাংলা ভাষা প্রচলন সপ্তাহ । সেই দিন থেকে পূর্ব বাংলার অফিস-আদালত, দোকান পাট, গাড়ি সর্বত্র উর্দু ও ইংরেজীর পরিবর্তে বাংলা ভাষার প্রচলন শুরু হয়। ১৯৬৬সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষনা করলে অধিকাংশ নেতাসহ ডানপন্থী ও বামপন্থী নেতা মহল এর বিরোধিতা করে এই অবস্থায় কাজী আরেফ আহমেদ ও ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সাংসদ ছয় দফার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়। এবং সম্পূর্ণ পরিস্থিতি পাল্টে দেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু আটক হলে ছয় দফা আন্দোলন ৮৬ এর গণ আন্দোলন ,৬৯এর গণ অভ্যন্থান সংগঠনে ঢাকা মহানগরীতে কাজী আরেফ আহমেদের ভূমিকা অতুলনীয়। ১৯৭০ সালের ৭জুন স্বাধীনতা দিবসের আগে ৬ জুন রাতে কাজী আরেফ আহমেদ ও আসম আব্দুর রফ সহ স্বাধীন বাংলা পরিষদের অন্যান্য নেতারা জাতীয় পতাকার রূপদান করেন। পরদিন জয় বাংলা বাহিনীর কুচকাওয়াজে এই পতাকা বহন করা হয়। ১৯৭১সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্বাধীন বাংলার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় আসম আব্দুর রফ প্রথম ঐ পতাকা উত্তোলন করেন। সেই দিন থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন। কাজী আরেফ আহমেদ ছিলেন “বেঙ্গল লিবারেশন ফন্ট”(বিএফ আই)বা মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠন ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩০শে মার্চ তিনি মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। পশ্চিম রণাঙ্গনে পাবনা,কুষ্টিয়া,চুয়াডাঙ্গা,যশোর,মেহেরপুর,ঝিনাইদাহ , মাগুরা, নড়াইল, খুলনা,বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর , গোপালগঞ্জ , রাজবাড়ি, ও ফরিদপুর নিয়ে গঠিত অঞ্চলের রিক্রটমেন্ট প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। মুক্তিযুদ্ধফেরত এক ঝাঁক উদীয়মান তরুণদের নিয়ে ১৯৭১সালে কাজী আরেফ গঠন করেন জাসদ ।১৯৭৫সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অবৈধ ক্ষমতা দখল ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আট বছরের লড়াইয়ে রাজপথে যে জোটটি পরিণত হয়ে উঠেছিল আন্দোলন সংগ্রামের চালিকা শক্তি , সেই “পাঁচ দল” এর শীর্ষ নেতৃত্ব ছিলেন তিনি। ফলশ্রুতিতে তাকে দীর্ঘদিন কারাভোগ করতে হয়। ১৯৯০ এর ঐতিহাসিক গণভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান সাহসী রূপকার ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধাপরধীদের বিচারের দাবিতে জননী জাহানারা ইমামকে সাথে নিয়ে গঠন করেন ১৯৭১এর ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি ।তিনি এর কেন্দ্রীয় স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য । ষাটের দশকের শুরু থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতির গতি প্রবাহ নিয়ন্ত্রন করে কাজী আরেফ আহমেদ এক বিচক্ষন রাজনীতির ভূমিকা পালন করেন।

পারিবারিক জীবনঃ বিপ্লবী বীর কাজী আরেফ আহমেদের স্ত্রীর নাম সংসদ সদস্য রওশন জাহান সাথী। তিনিও একজন বীর মুক্তিযুদ্ধা।  ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধে কাজী আরেফের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধথেকে শুরু করে জাসদ প্রতিষ্ঠা , স্বৈরচার সরকার বিরুধী আন্দোলন সকল ক্ষেত্রেই কাজী আরেফের একজন সক্রিয় কর্মীর নাম স্ত্রী রওশন জাহান সাথী। রাজনৈতিক জীবনের বাইরে তারা গড়ে তুলেছিল এক শান্তিময় নীড়।নির্লোপ এই দুজন রাজনীতিবিদদের অর্থের প্রতি কোন লোভ ছিলনা। তাই তাদের বাড়িতে স্থান পায়নি দামী দামী আসবাবপত্র। স্বামী স্ত্রী এক হয়ে কাজ করেছেন মেহনতি এবং শ্রমজীবি মানুষের পক্ষে গড়েছেন এক অনুকরনীয় পারিবারিক জীবন।

মৃত্যুঃ শোষন মুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার নেতা জীবনের শেষ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শ্রমজীবি ,কর্মজীবী , পেশাজীবি জনগনের অধিকার ,ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শ্রমকর্ম পেশার প্রতিনিধি এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি হয়ে সমগ্র দলকে একাত্নতার জন্য কাজ করেছেন । সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তিব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি বিভিন্ন জায়গায় সভা সমাবেশ করেন । তারই অংশ হিসেবে ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি যান কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার কালিদাসপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের জাসদের মঞ্চে। এটিই তার জীবনের শেষ সভা । সেই দিন জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদ সহ আরো কয়েকজন জাসদনেতাকে নির্মম ভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করে একদল অস্রধারী সন্ত্রাসী। প্রত্যক্ষ দর্শীদের মতে ঐ দিন বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়া হয়েছিল।

====০০০=====

মোহাম্মদ কাশেম

প্রাথমিক পরিচয়ঃ

মোহাম্মদ কাশেম ছিলেন সাংবাদিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, রেডিও ব্যক্তিতব ঔপন্যাসিক। সমাজের অবহেলিত ও নিপেড়িত মানুষের বন্ধু। সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনায় ছিল তার অন্যবদ্য অবদান। চল্লিশের দশকের সাহিত্য ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে একটি পরিচিত নাম। রেডিওতে নাটক, কবিতা সহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্টান করে তিনি ঐ সময় খুবই জনপ্রিয় হন। মোহাম্মদ কাশেম যে নামটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে কালের শ্রোতে। বর্তমান সমাজে যে নামটি আজ রয়ে গেছে পাঠকের আড়ালে।

 

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ

মোহাম্মদ কাশেম কুমিল্লা শহরে ১৯০৫ সালে পিতার কর্মস্থলে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম  সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন মায়ের নাম শাহের বান্নু খানম। তার বাবা ছিল স্কুলের শিক্ষক। তিনি ছিল একজন মৌলভী। আরবি, ফার্সিতে তিনি ছিল পণ্ডিত, তার পূর্ব পুরুষের বসতি ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশে। পরে তিনি তৎকালীন ত্রিপুরা ( বর্তমান কুমিল্লা) এসে বসতি গড়েন। তার বাবা জীবনে দুটি বিয়ে করেন। মোহাম্মদ কাশেম ছিল তার দ্বিতীয় ঘরের সন্তান। এছাড়া ১ম ঘরে মোহাম্মদ কাশেম এর আরও চার ভাই রয়েছে। এরা হলেন মোহাম্মদ সৈয়দ, সৈয়দ ইয়াসিন, মোহাম্মদ হাসেম, মোহাম্মদ নাজেম ও মোহাম্মদ তামেজ।

 

শিক্ষা জীবনঃ

 

মোহাম্মদ কাশেমের পরিবারের সবাই ছিল শিক্ষিত। তার বাবা পড়ালেখার প্রতি ছিল খুবই আগ্রহী। তাই তার বাবা মোহাম্মদ কাশেমকে বাল্য শিক্ষা দেন। এরপর তাকে ভর্তি করেন কুমিল্লা শহরে একটি স্কুলে যেখানে তার বাবা নিজে চাকরি করেন। তার বাবার সাথে তিনি স্কুলে যান। ক্লাসের শিক্ষকরা তাকে খুবই ভালবাসতেন ও আদর করতেন কারন সে ছিল খুবই ভাল ছাত্র। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রবেশিকা পরীক্ষার পূর্বে তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। তার বাবার মৃত্যুতে তার সংসারের আসে চরম অভাবের কারনে তিনি পড়ালেখা ছেড়েদেন। এখানেই তিনি লেখাপড়ার ইতি টানেনে।

 

কর্ম জীবনঃ

মোহাম্মদ কাশেমের বাবার মৃত্যুর পর সংসারে অভাব দেখা দিলে তার মা সাহের বানু তাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে মোহাম্মদ কাশেম একটি দোকানে কোন রকম বেতনে চাকরি নেন। এই বেতনে কোন মতেই সংসার চলতনা। তাই তিনি চরম দুঃখ, দারিদ্রতা নিয়ে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯২৩ সালে কলকাতায় চলে যান। সেখানে তিনি পানি খেয়ে রাস্তায় ঘুমাতেন। এরপর কিছু দিন পর তিনি পত্রিকা বিক্রি করেন। ১৯২৬ সালে তিনি আবার ঢাকায় এসে নিজেই ছোট একটি দোকান দেন। এরপর তিনি পত্রিকার সম্পাদনার সাথে জড়িত হন। এখানেও কিছু না করতে পেরে একটি ষ্টেশনারী দোকানে স্বল্প বেতনে চাকরি নেন। ১৯২৯ সালে আবার চাকরি ছেড়ে তিনি কলকাতায় চলে যান। কলকাতায় তিনি কিছুদিন হকারি করে দিন কাটান।

 

বিবাহ বন্ধন ও পারিবারিক জীবনঃ

মোহাম্মদ কাশেম ১৯২৯ সালে ঢাকার মেয়ে খাইরুল নেমাকে বিয়ে করেন। ১৯৩১ সালে মোহাম্মদ কাশেমের ও খাইরুল নেমার ঘরে আসে আব্দুল কাইউম। তখন মোহাম্মদ কাশেম ও খাইরুল নেম ছিল কলকাতায়। ১৯৩৩ সালে জন্ম নেয় ২য় সন্তান আবু তাহের। ১৯৩৬ সালে জন্ম নেয় ৩য় সন্তান হাবিবুর রহমান। ১৯৩৯ সালে যখন মোহাম্মদ কাশেম ঢাকায় চলে আসেন তখন জন্ম নেয় তার ৪র্থ সন্তান হাজেরা খাতুন। ১৯৪৫ সালে জন্ম নেয় ৫ম সন্তান জামেলা খাতুন খাইরুল নেমাকে বিয়ের পর মোহাম্মদ কাশেমের জীবনে আসে পরিবর্তন। তারা দুজনের দম্পতি জিবন ছিল সুখের। যদিও শত দরিদ্র ও তাদের জীবনে ভাঙন ধরাতে পারেনি। বরং এ দারিদ্রতার মাঝেও খাইরুল নেমা তাকে প্রেরনা দিয়েছেন বড় হওয়ার জন্য।

 

সাংবাদিক জীবনঃ

মোহাম্মদ কাশেমের কলকাতায় গিয়ে পত্রিকা বিক্রি করতেন তখন থেকে তিনি পত্রিকার প্রতি একটু আনুরাগি ছিল। কলকাতা থেকে ঢাকা ফেরার পর ১৯২৬ সালে তিনি ‘ দরিদ্র’’ পত্রিকায় চাকরি থাকা অবস্থায় তিনি নিজে ‘ অভিযান নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেন। এই পত্রিকাটির নাম দেন কাজী নজরুল ইসলাম। কিছু দিন পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯২৯ সালে তিনি কলকাতায় গিয়ে ‘ সোলতান’’ নামের একটি পত্রিকায় চাকরি নেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের অতি নিকটে আসেন। সোলতান পত্রিকা বন্ধ হলে তিনি ‘ বেদুইন’ পত্রিকার সহ সম্পাদক হিসেবে যোগদেন। ১৯৩৪ সালে তিনি ‘সবুজপত্র’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকের ভার গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন । মোহাম্মদ কাশেম এক সময় ‘ সওগাত’ পত্রিকায় জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে প্রকাশনা শিল্পের সাথে জড়িয়ে পড়েন।

 

সাহিত্যিক জীবনঃ

মোহাম্মদ কাশেমের সাহিত্যর ক্ষেত্রে উন্ন্যেস ঘটে যখন তিনি দরিদ্র ও অভিযান পত্রিকায় সম্পাদনায় ছিলেন। ঐ সময় তিনি দরিদ্র ও অভিযান পত্রিকায় প্রচুর লেখতেন। ১৯২৮ সালে সংগত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘ মহা কবি হাসমান- বিন- সাবেত নামে একটি প্রবন্ধ। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘ কবি ইমরুল কায়েসের নামে আরও একটি বিশেষ প্রবন্ধ। একই বছর ‘ মহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘ বারোয়ারী উপন্যাস’’ নামে একটি গ্রন্থ কিস্তিতে বের হতে থাকে। এছাড়া ঐ বছর প্রথম অংশ প্রকাশিত হয় ৩য় বর্ষ সংখ্যা। ১৯৩৩ সালে বের হয় তার ২য় উপন্যাস আগামী বারে সমাপ্য। একই বছর অভিযান পত্রিকায় বের করে ‘ ধান ক্ষেত’ নামে একটি পুস্তক। ১৯৩৯ সালে বের হয় ‘ আধুনিক বাংলা সাহিত্য মুসলমান’’ ।  ১৯৪৩ সালে মোহাম্মদ কাশেম বাঙ্গালী পত্রিকায় প্রকাশ করেন ছোট গল্প ‘ পুনরাবৃত্তি’’ । ১৯৪৮ সালে আরবি কাব্যর ২য় অংশ প্রকাশিত হয় সওগাত পত্রিকায়। ১৯৪৯ সালে ‘ চিড়িয়া উড় গেয়ি’’ নামক একটি গল্প বের হয় পাকিস্থান পত্রিকায়। ‘ চকবাজারের কালুভাই’’ একটি করুন গল্প বের হয় ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট পঞ্চায়েত পত্রিকায়।

 

বেতার নাটক ও অন্যান্য অনুষ্টানে মোহাম্মদ কাশেম

১৯৪০ সালে দিকে মোহাম্মদ কাশেম ওল ইন্ডিয়া রেডিও এর সাথে সম্পৃক্ত হন। ঐ সময় তিনি রেডিও ঢাকা কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন অনুষ্টান সম্প্রচার করতেন। সংবাদ পাঠকের জন্য তিনি সংবাদ লিখে দিতেন। তিনি রেডিওতে বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তি করতেন। নবীদের ধারাবাহিক জীবনী নিয়ে তিনি ‘ নবী কাহিনী’ নামে একটি কাহিনী লিখেন এবং টা রেডিওতে প্রচার করে তৎকালীন মুসলিম সমাজে আলোচিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়। রেডিওতে প্রচারের জন্য তিনি ১৯৪২ সালে ‘ সোহরাব রুস্তম’’ ও ‘ মনসুর ডাকাত’ নামে দুটি নাটক লিখেন। যা পরে রেডিওতে ধারাবাহিক ভাবে প্রচার হয়। ১৯৪৭ সালে ‘ যারা কাঁদে’ নামক আরেকটি ফিচার নাটক লিখে যা পরে রেডিওতে ধারাবাহিক ভাবে প্রচার হয়। ১৯৪৮ সালে ‘ শতাব্দীর আলো’ নামে  একটি নাটক রচনা করেন এবং গ্রামোফোনে রেকর্ড করে বাজারে বিক্রি করেন।

 

প্রকাশনা শিল্পে মোহাম্মদ কাশেম

১৯৩৯ সালে মোহাম্মদ কাশেম ‘ মখদুমি লাইব্রেরী এন্ড আহসানউল্লাহ বুক হাউস এর ঢাকা শাখার ম্যনেজার নিয়োগ হন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভঙ্গ হয়ে গেলে ‘ মখদুমি লাইব্রেরী এন্ড আহসানউল্লাহ বুক হাউস এর মালিক এটি বিক্রি করার সিধান্ত নেন। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ কাশেম এটি নিজি ক্রয় করে নতুন নামে চালু করেন। তিনি এটির নাম দেন ফরাজ দিল প্রকাশ’। এরপর তিনি পুস্তক প্রকাশনায় ব্যপক সাফল্য লাভ করেন। তার প্রকাশনায় বের হয় দীনেশ চন্দ্র সেনের প্রাচিন বাংলার সাহিত্য মুসলমানদের অবদান, মুজিবুর রহমান খানের পাক ভারতের ইতিহাস সম্ভলিত ইতিহাস গ্রন্থ ‘নয়া তারিখ’’ সৈয়দ আলী আহসান রচিত Our lteritage’১৯৪৯ , মুসলিম রেনেসার কবি ফররুখ আহমেদ রচিত পাঠ্য বই ‘ নয়া জামাত’’ সহ অনেক নামকারা লেখকের বিখ্যাত বই সমূহ। ফলে প্রকাশনা শিল্পে মোহাম্মদ কাশেমের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মোহাম্মদ কাশেমের প্রকাশনায় প্রকাশিত বিয়ের প্রচ্ছদ আঁকতেন শিল্পাচয জয়নুল আবেদীন , পটুয়া কামরুল ইসলাম সহ বিখ্যাত শিল্পীরা।

 

সামাজিক কর্মকাণ্ডঃ

মোহাম্মদ কাশেম জীবনে দারিদ্রতা কাকে বলে হারে হারে টের পান। তায় সমাজের দারিদ্রদের জন্য তার মন সর্বদায় কাঁদতেন। ১৯৪১ সালে দাঙ্গায় চরম আর্থিক সংকটে দেখা দেয়। সাধারণ মানুষ না খেয়ে মারা যেত। তাই তিনি ঐ সময় দাঙ্গা কবনিতে মানুষের সাহায্যর জন্য ‘ নওজোয়ান ক্লাব’ নামে একটি সেবা মূলক প্রতিষ্টান করেন। এই প্রতিষ্টান থেকে গরীব দুস্থ মানুষকে সাহায্য করা হত। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় তাদের সম্পর্কে লেখে তাদের সাহায্যর জন্য সম্পদশালিদের কাছে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৪৫ সালে ২য় বিশ্ব যুব্দের সময় তিনি স্থানীয় সম্পদশালিদের নিয়ে A R P( Air Raid Precuation) নামে একটি সেচ্ছাসেবক দল গঠন করেন। ১৯৩৩ সালে মোহাম্মদ কাশেম ঢাকার রহমতগঞ্জ স্থানীয় লোকদের নিয়ে ‘’ রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি’’ (রহমতগঞ্জ ক্লাব) প্রতিষ্টান করেন। এবং এর প্রতিষ্টানকালীন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি তৎকালীন সময়ে শিক্ষা সংস্কৃতি সহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণ করে সুনাম অর্জন করেন।

 

সন্মাননা ও স্বীকৃতিঃ

মোহাম্মদ কাশেম জীবনে পেয়েছেন বহু পাঠকের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। তিনি কাজ করেছেন মানুষের জন্য নিজের স্বীকৃতির কথা কোন দিন চিন্তা করেনি। মোহাম্মদ কাশেম জীবনে কোন পুরষ্কার পায় কিনা জানা যায়নি।

 

মৃত্যুঃ

মোহাম্মদ কাশেম মৃত্যুর পূর্বে প্রচুর অর্থ সংকটে ভুগেন। এছাড়া ঐ সময়ে তার স্বাস্থ্যও ভাল যাচ্ছিলনা । অবশেষে ১৯৫৭ সালে ২২ শে নভেম্বর মোহাম্মদ কাশেম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।